সোমবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর লাশের কী হয়েছিল, জানালেন তৎকালীন ডিসি

৫ নভেম্বর ২০২৫

গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল জিয়া হ’ত্যা: তৎকালীন ডিসি

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হ’ত্যাকে একটি গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল এবং পরিকল্পিত হ’ত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন সেই সময়কার জেলা প্রশাসক (ডিসি) জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী। ৪৪ বছর আগের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার বিস্তারিত জানাতে গিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়ার লাশ নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রকৃত বিবরণ দিয়েছেন।

লাশ রাঙ্গুনিয়ায় দাফন, পরে উদ্ধার

জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী জানান, হ’ত্যাকাণ্ডের পর সার্কিট হাউস থেকে প্রেসিডেন্ট জিয়ার লাশ সেনারা নিয়ে যায়। পরে রাঙ্গুনিয়া থানার পুলিশ থেকে জানা যায়, সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য একটি মিলিটারি ট্রাকে করে মৃতদেহ রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানির কাছে একটি খালি জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে অস্ত্রের মুখে একজন মৌলবিকে দিয়ে লাশ কার তা না জানিয়েই জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করা হয়।

ঘটনাটি জানাজানি হলে চট্টগ্রাম পুলিশ সুপারের নির্দেশে লাশ কবর থেকে উঠিয়ে ট্রাকে করে চট্টগ্রাম অভিমুখে আনা হচ্ছিল। এই খবর পেয়ে ডিসি জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী, পুলিশ সুপার এবং বিভাগীয় কমিশনার রাঙ্গুনিয়া যান এবং পথে গাড়ি থামিয়ে লাশবাহী ট্রাকটিকে সেনানিবাসে নিয়ে যেতে বলেন।

সেনানিবাসে ড্রেসিং ও জানাজা

সিদ্ধান্ত হয়, প্রথমে লাশ সেনানিবাসে নিতে হবে এবং সেখান থেকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় পাঠানো হবে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারের কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার আজিজকে খবর দিয়ে ঢাকায় হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা হয়। সেনানিবাসে লাশ মর্গে নিয়ে ড্রেসিং করা হয়। তৎকালীন সহকারী প্রধান সামরিক ডাক্তার লে. কর্নেল তোফায়েল ড্রেসিংয়ের পর ডিসিকে লাশ দেখতে ডাকেন। তিনি দেখেন মৃতদেহ ব্যান্ডেজে বাঁধা, তবে মুখ খোলা। একটি গালে কোনো মাংস নেই এবং গোঁফের একটি অংশও নেই।

ব্রিগেডিয়ার আজিজ জানান, সেনাসদস্যরা জিয়ার জানাজা ছাড়া মৃতদেহ ঢাকায় পাঠাতে দেবেন না। পরে হেলিপ্যাডে লাশবাহী হেলিকপ্টারকে সামনে রেখে গ্যারিসনের একজন মাওলানা প্রায় শ-তিনেক সৈন্যের উপস্থিতিতে জানাজা পড়ান। জানাজা শেষে কফিনসহ হেলিকপ্টার ঢাকার দিকে উড়াল দেয়। বিকালে লালদীঘি ময়দানে লাখ লাখ লোকের উপস্থিতিতে জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

হ’ত্যার আগের রাতে সার্কিট হাউসে যা ঘটেছিল

হ’ত্যার আগের দিন, ২৯ মে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ডিসি জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর সর্বশেষ দেখা হয় রাত ৯টার কিছু সময় পর্যন্ত সার্কিট হাউসে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও, দলীয় কোন্দল মেটানোর বৈঠক দীর্ঘ হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। রাত ৯টার পর প্রেসিডেন্টের একান্ত সচিব জানান, প্রেসিডেন্ট তাদের চলে যেতে বলেছেন এবং সকালে কথা বলবেন।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মাত্র দুই সপ্তাহ পর আবার চট্টগ্রামে আসায় ডিসি বিস্মিত হয়েছিলেন। সাধারণত এক মাস আগে ডিসিকে জানানোর নিয়ম থাকলেও, ৪৮ ঘণ্টার নোটিসে রাজনৈতিক কারণে তিনি চট্টগ্রামে আসেন বিএনপির দুই গ্রুপের অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্য

২৯ মে সকালে প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন ডিসি, বিভাগীয় কমিশনারসহ অন্যান্য সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা। তবে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুর সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তার বদলে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার আজিজ। জেনারেল মঞ্জুর ব্যথা পাওয়ায় আসতে পারেননি শুনে জিয়া হাসি মুখে আজিজকে বলেন, “মঞ্জুরকে বলো টেনিস একটু কম খেলতে।”

বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে প্রেসিডেন্ট জিয়া ডিভাইডার তুলে রাস্তা প্রশস্ত করার কথা বলেন এবং শৃঙ্খলা প্রসঙ্গে বলেন, “শুধু ৯ মাসের যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হয়ে গেল বলে বাঙালি বুঝে উঠতে পারেনি। যদি ভিয়েতনামের মতো ২০ বছর যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হতো, তাহলে বুঝত।”

সার্কিট হাউসে পৌঁছানোর পর প্রেসিডেন্ট চন্দনপুরা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন এবং দুপুরের খাবারের পর দলীয় বৈঠক শুরু করেন।

সর্বশেষ