ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত আবারও শুরু হয়েছে বলে মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে নতুন করে আরও ৬০ দিনের একটি সময়সীমা শুরু হলো। এর ফলে, কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
কংগ্রেসকে পাঠানো ওই চিঠিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, গত ৭ জুলাই থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু হয়েছে। চিঠিতে তিনি লেখেন, “মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থ রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ হিসেবেই আমি এই সামরিক পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছি।”
সমঝোতা ভঙ্গের অভিযোগ
ট্রাম্পের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ১৭ জুন ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) ভঙ্গ করেছে তেহরান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান হামলা চালানোর পরেই এই সমঝোতা ভেস্তে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির বিরুদ্ধে আবারও সরাসরি সামরিক হামলার নির্দেশ দেন।
চিঠিতে ট্রাম্প প্রশাসন আরও জানায়, গত ৭ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং পরবর্তীতে সেটির মেয়াদ বাড়িয়ে সংঘাতের একটি কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ইরানের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে তা সফল হয়নি।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংঘাত নতুন করে তীব্র রূপ ধারণ করেছে। সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর উপসাগরীয় অবরোধ আবারও পুনর্বহাল করা হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে।
যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা নিয়ে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করার একক ক্ষমতা কেবল মার্কিন কংগ্রেসের। তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমিত সময়ের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন।
‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, কোনো সামরিক অভিযান শুরু করার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসকে তা জানাতে হয়। একইসঙ্গে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া শুরু হওয়া যেকোনো সামরিক অভিযান ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইরান ইস্যুতে প্রথম ৬০ দিনের এই সময়সীমা গত ১ মে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ট্রাম্পের দাবি, মাঝে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাধ্যমে আগের সংঘাতের সমাপ্তি ঘটেছিল, ফলে পূর্বের সময়সীমা এখন আর প্রযোজ্য নয়। যদিও সমালোচকদের মতে, যুদ্ধবিরতির সময়েও ইরানে মার্কিন হামলা এবং দেশটির বন্দর অবরোধ অব্যাহত ছিল।
ট্রাম্পের ব্যাখ্যার তীব্র সমালোচনা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই আইনি ব্যাখ্যা মানতে নারাজ বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা এবং যুদ্ধবিরোধী কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্টের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিনিধি পরিষদের এক জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাটিক সহকারী বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইচ্ছামতো কয়েক মাসের একটি যুদ্ধকে শেষ হয়ে গেছে বলে দাবি করতে পারেন না, বিশেষ করে যখন তিনি নিজেই বলেছিলেন এই যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হবে না।”
গত মাসে মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষেই একটি যৌথ প্রস্তাব পাস হয়, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান থেকে মার্কিন বাহিনীকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। রিপাবলিকানদের অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও এই প্রস্তাব পাস হওয়া প্রমাণ করে যে, দীর্ঘায়িত এই সংঘাত নিয়ে কংগ্রেসের ভেতরে তীব্র উদ্বেগ রয়েছে।
তবে ওই ভোটের পর ট্রাম্প তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছিলেন, যারা এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন তারা মূলত ইরানকে ‘স্বস্তি’ দিচ্ছেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাজকে ‘আরও কঠিন’ করে তুলছেন।



