তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে সরকার তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করলেও বাস্তবে সেই আইনের কার্যকারিতা নানা কারণে প্রশ্নের মুখে পড়ে। প্রশাসনিক জবাবদিহির ঘাটতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা কৌশলের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায় না। কোথাও কোথাও দীর্ঘ অপেক্ষার পর তথ্য মিললেও তা তখন গুরুত্ব হারায়। এ পরিস্থিতিতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে গণমাধ্যমকে প্রায়ই সূত্রনির্ভর তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এবার সেই তথ্যপ্রবাহ আরও নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর গোপন তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ ঠেকাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর কড়া নজরদারি ও মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করা হয়েছে।
আদেশে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর কথা উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, এ আইনের পরিপন্থী কোনো তথ্য ফাঁস হলে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথিপত্র এবং ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কী বার্তা দিচ্ছে এই সতর্কতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ছাড়া সাধারণ প্রশাসনিক তথ্য জনস্বার্থেই প্রকাশযোগ্য। সরকার কী করছে এবং কীভাবে করছে— তা জানার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কড়া সতর্কতা ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
তাদের মতে, কোনো প্রক্রিয়া যখন অস্বচ্ছ হয়ে ওঠে, তখন গোপনীয়তার দেয়াল আরও শক্ত করা হয়। সাম্প্রতিক নির্দেশনাকে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং একটি বড় প্রশ্নের সূচক হিসেবে দেখছেন তারা— রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা সুরক্ষিত হচ্ছে, নাকি তথ্য গোপনের সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে।
কেন এ নির্দেশনা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখার গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে পুলিশের বদলি-পদায়ন, শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিবেদন, তদন্তের অগ্রগতি এবং কিছু কৌশলগত নীতিগত প্রস্তাব নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশিত নথি ছিল হুবহু অনুলিপি, আবার কোথাও গোপন বৈঠকের সিদ্ধান্তের সারসংক্ষেপ সংবাদে উঠে আসে। মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে এসব ঘটনাকে ‘তথ্য ফাঁস’ হিসেবে বিবেচনা করেই সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগ থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সাংবাদিক জানান, প্রকাশিত তথ্যের বড় অংশই ছিল জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন নির্দেশনার ফলে তথ্য ফাঁস মনিটরিং, গোপনীয়তার কড়াকড়ি এবং শাস্তির আশঙ্কা—সব মিলিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর আরও সংকুচিত হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, নির্দেশনার পর অনেক কর্মকর্তা গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলছেন। কেউ কেউ কথা বললেও তাতে উদ্বেগ ও শঙ্কার প্রকাশ রয়েছে।
সেকেলে আইনের নতুন প্রয়োগ
নির্দেশনায় ১৯২৩ সালের ব্রিটিশ আমলের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। এই আইন রাষ্ট্রীয় নথিকে গোপন ঘোষণার বিস্তৃত সুযোগ দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি বা সামরিক পরিকল্পনা গোপন রাখা যুক্তিসংগত হলেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বদলি-পদায়ন কিংবা আর্থিক স্বচ্ছতার তথ্য এই আইনের আড়ালে ঢেকে রাখা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘এখন সাধারণ কথাবার্তাতেও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
অন্য একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সংবেদনশীল তথ্য বাইরে গেলে নিরাপত্তা কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সব তথ্য গোপন রাখা সমাধান নয়।’
শাস্তির ভয় ও নীরবতার পরিবেশ
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তথ্য ফাঁসের ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা এমনকি চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তিও হতে পারে। এতে প্রশাসনের ভেতরে অনিয়ম, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের ঝুঁকি বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, নিরাপত্তার অজুহাতে সব তথ্য গোপন করা হলে জবাবদিহির জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
তথ্য অধিকার বনাম গোপনীয়তা
একদিকে তথ্য অধিকার আইন নাগরিককে তথ্য জানার অধিকার দিয়েছে, অন্যদিকে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট গোপন তথ্য প্রকাশকে দণ্ডনীয় করেছে। এই দুই আইনের মধ্যকার টানাপোড়েনই বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্য সুরক্ষা ও নাগরিকের জানার অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।
নতুন নির্দেশনার পর প্রশাসনের ভেতরে একটি স্পষ্ট বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে— গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে কঠোরভাবে। এতে একদিকে নিরাপত্তা-সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষিত থাকবে, অন্যদিকে দুর্নীতি বা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত নথি প্রকাশ আরও কঠিন হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মত
প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট একটি ঔপনিবেশিক আইন, যা বর্তমান সংবিধান ও তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার মতে, বদলি-পদায়ন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গোপন করার চেষ্টা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ ও তথ্য অধিকার আইনের মূল দর্শনের পরিপন্থী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ ধরনের নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য তথ্য সুরক্ষা নয়, বরং ভয় সৃষ্টি করা। এতে কর্মকর্তারা সত্য-মিথ্যা বিবেচনা না করে চুপ থাকাকেই নিরাপদ মনে করেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিনের মতে, সব তথ্যকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা একটি পুরোনো প্রশাসনিক প্রবণতা। অতিরিক্ত নজরদারি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাশেদা রওনক বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই অবস্থান প্রশাসনিকের পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। তার মতে, সমালোচনামূলক তথ্যকে নিরাপত্তার ছাতার নিচে ঢুকিয়ে দিলে দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয় এবং আস্থার সংকট তৈরি হয়।



