১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশে কি বিশ্বকাপ দেখা যাবে, যা জানা গেল

১৮ মে ২০২৬

ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা উঠতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত এই টুর্নামেন্টটির অফিশিয়াল সম্প্রচারস্বত্ব চূড়ান্ত হয়নি। ফলে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের মনে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সম্প্রচার বিশেষজ্ঞ এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ‘বিশ্বকাপ ব্ল্যাকআউট’ বা খেলা দেখা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বড় স্বস্তির খবর হলো, দেশের প্রথম বেসরকারি ক্রীড়া চ্যানেল টি-স্পোর্টস এখনও বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে আশাবাদী এবং স্বত্ব কেনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে জোরালো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

অতিরিক্ত দামের কারণেই কি এই জটিলতা?

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন বাজার ও সম্প্রচার আয়ের বাস্তবতায় এবারের স্বত্বের যৌক্তিক মূল্য হওয়া উচিত ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার মধ্যে। বেশ কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এই অঙ্কে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুতও ছিল।

তবে অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের জন্য প্রাথমিক স্বত্ব পাওয়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক মিডিয়া সংস্থা ‘স্প্রিংবক’ ও তাদের দেশীয় সহযোগীরা অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় প্রায় ৭.২ মিলিয়ন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৮ কোটি টাকা) স্বত্ব কেনে। পরবর্তীতে তারা বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) কাছে তা ১০ মিলিয়ন ডলারে (প্রায় ১২২ কোটি টাকা) বিক্রির প্রস্তাব দেয়। এর বাইরে স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকেও তাদের মোটা অঙ্কের আয়ের পরিকল্পনা ছিল। এই আকাশচুম্বী দামের কারণেই মূলত বিটিভি এবার স্বত্ব কেনা থেকে পিছিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে ফিফাকে ৬০ শতাংশ অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করতেও ব্যর্থ হয়েছে স্প্রিংবক।

পেছনে সক্রিয় ‘সিন্ডিকেট’ চক্র?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি বিশেষ সিন্ডিকেট নিজেদের স্বার্থে ‘বাংলাদেশে খেলা সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যেতে পারে’, এমন ভীতি ছড়িয়ে সরকারি পর্যায়ে চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। এই চক্রটি কাতার বিশ্বকাপের সময়ও সক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সেবার বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিটিভিকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাভমোর’ এবং বাংলাদেশের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হওয়া সেই কৃত্রিম অতিমূল্যায়নের কারণেই ফিফার কাছে বাংলাদেশের বাজারের ভুল চিত্র গেছে, যার প্রভাব পড়ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের স্বত্ব নির্ধারণেও। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় প্রতিনিধি ফাহাদ করিম, সাবেক বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন, সাবেক ফুটবল কর্মকর্তা আবু নাঈম সোহাগ এবং আতাউল ইসলাম মানিকের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা এখন এই সিন্ডিকেটের ভয়কে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ নিশ্চিত করা এবং কাতার বিশ্বকাপের আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি তুলছেন।

ফিফার নমনীয়তার ইতিহাস ও শেষ মুহূর্তের আশা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো ফুটবলপ্রেমী ও বড় দর্শক বাজারকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করবে না ফিফা। ব্যবসায়িক স্বার্থেই শেষ মুহূর্তে কোনো না কোনো বিকল্প পথ বের হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে ফিফা কতটা নমনীয় হতে পারে, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ চীন। চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) কাছে ২০৩১ সাল পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির ক্ষেত্রে ফিফা শুরুতে ৩০০ মিলিয়ন ডলার দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত সময় পার্থক্যের কারণে মাত্র ৬০ মিলিয়ন ডলারে চুক্তি করেছে। এখনও প্রতিবেশী দেশ ভারতের সম্প্রচারস্বত্বও নিশ্চিত হয়নি, যা প্রমাণ করে দরকষাকষি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চলতে পারে।

যেহেতু টি-স্পোর্টস এখনও স্বত্ব কেনার দৌড়ে সক্রিয়ভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, তাই শেষ মুহূর্তে দেশীয় কোনো বেসরকারি টেলিভিশন বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই বাংলাদেশের দর্শকরা পর্দায় খেলা দেখতে পাবেন—এমন সম্ভাবনাই সবচেয়ে জোরালো।

সর্বশেষ