২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মাত্র ৩৮ মাসে যেভাবে বিশ্বের বৃহত্তম রেলস্টেশন বানাল চীন

যেখানে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ বড় বড় মেগা প্রকল্প শেষ করতে বছরের পর বছর, এমনকি কয়েক দশক ধরে লড়াই করে; সেখানে চীন মেঝের আয়তনের (ফ্লোর এরিয়া) দিক থেকে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে স্টেশনটি তৈরি করে দেখাল মাত্র তিন বছরের সামান্য কিছু বেশি সময়ে। মানুষের পাশাপাশি এক দল অত্যাধুনিক রোবট বাহিনী ব্যবহার করে মাত্র ৩৮ মাসে এই অবিশ্বাস্য ও নিখুঁত স্থাপনা নির্মাণ করেছে পরাশক্তি চীন।

সদ্য সমাপ্ত গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাই-প্রোফাইল সফরসঙ্গী দলের অংশ হিসেবে চীন সফর করেন বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি বিলিয়নেয়ার ইলন মাস্ক। সফরকালে চীনের এই ‘চংকিং ইস্ট’ রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণের একটি ভিডিও নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে শেয়ার করেন তিনি। গণপরিবহন নিয়ে অতীতে সবসময় সংশয় প্রকাশ করে আসা মাস্ক চীনের এই অবিশ্বাস্য গতি দেখে ভিডিওটি শেয়ার করতে বাধ্য হয়েছেন বলে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

কত বড় এই রেলওয়ে স্টেশন?

দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে অবস্থিত জনসংখ্যা এবং প্রশাসনিক এলাকার দিক থেকে দেশটির বৃহত্তম শহর ও অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি চংকিং। এই শহরের দ্রুত বর্ধনশীল যোগাযোগ চাহিদা মেটাতে ১ দশমিক ২২ মিলিয়ন বর্গমিটারের এই বিশাল ‘চংকিং ইস্ট রেলওয়ে স্টেশন’টি তৈরি করা হয়েছে। এটি মূলত একটি বিশাল বহুমুখী ট্রানজিট কমপ্লেক্স, যা ২০২৫ সালের মে মাসে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

  • স্টেশনের বিশালতা: ১ দশমিক ২২ মিলিয়ন বর্গমিটার আয়তনের এই স্টেশনে রয়েছে ১৫টি প্ল্যাটফর্ম এবং ২৯টি ট্র্যাক, যা তিনটি রেল ইয়ার্ডে বিভক্ত।
  • যাত্রী ধারণক্ষমতা: ব্যস্ত সময়ে (পিক আওয়ার) এটি প্রতি ঘণ্টায় ১৬ হাজার যাত্রী পরিচালনা করতে সক্ষম।
  • বহুতল কমপ্লেক্স: ৮ তলা পর্যন্ত বিস্তৃত এই বহুতল কমপ্লেক্সে হাই-স্পিড রেল, সাধারণ রেল, মনোরেল, বাস ও ট্যাক্সির সমন্বিত সুবিধা রয়েছে।

যেভাবে কাজ করল চীনের ‘রোবট বিপ্লব’

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের মে মাসে নকশা চূড়ান্ত করার পর ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে মাত্র ৩৮ মাসে এই প্রকল্পের সমাপ্তি সম্ভব হয়েছে একটি ‘রোবট বিপ্লব’-এর কারণে। গ্রীষ্মকালে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি চরম তাপমাত্রার মধ্যে রুক্ষ পাহাড়ি ভূখণ্ডে এই প্রকল্পটি পুরোপুরি রোবট বাহিনীর ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়েছে।

  • লেজার-গাইডেড স্ক্রিড রোবট: লিডার, এআই (AI) এবং ফাইভ-জি (5G) প্রযুক্তি সম্বলিত এই রোবট মানুষের চেয়ে তিন গুণ দ্রুত এবং মিলিমিটার নিখুঁতভাবে কংক্রিট লেভেলিংয়ের কাজ করেছে। যা শ্রমিকের খরচ কমিয়েছে ৪০ শতাংশ।
  • গ্লাস ইনস্টলেশন রোবট: ৮০০ কেজি ওজনের কাঁচের প্যানেলগুলো অত্যন্ত নিরাপদে এবং নিখুঁতভাবে স্থাপন করেছে এই রোবট। যা সাধারণের চেয়ে তিন গুণ দ্রুত এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি ৯০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে।
  • অন্যান্য রোবট: এর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যুক্ত ছিল অমনিডাইরেকশনাল ওয়েল্ডিং রোবট এবং ২৪ ঘণ্টা টহল দেওয়া পাহারাদার রোবট।

রোবট ব্যবহারের ম্যাজিক ফিগার:

চায়না রেলওয়ে ব্যুরোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখুঁতভাবে রোবোটিক্স ব্যবহারের ফলে মেগা প্রকল্পটিতে: ১. শ্রমিকের খরচ প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ২. কাজের গড় দক্ষতা বেড়েছে তিন গুণ। ৩. নিরাপত্তাজনিত দুর্ঘটনা কমেছে ৯০ শতাংশ

চংকিং ইস্ট স্টেশন কেবল রোবটের ব্যবহার নয়, বরং শিল্পক্ষেত্রের যেকোনো বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের দীর্ঘমেয়াদি ও অবিশ্বাস্য সক্ষমতারই এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

সর্বশেষ