বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দিকপাল, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক তোফায়েল আহমেদ আর নেই। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। মৃত্যুকালে প্রবীণ এই জননেতার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক বিকাশের এক বর্ণাঢ্য ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তোফায়েল আহমেদের চলে যাওয়ার খবরে দেশজুড়ে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রাজনৈতিক জীবন ও গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক
১৯৪৩ সালে ভোলা জেলায় জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদ ছাত্রজীবনেই রাজনীতির পাদপ্রদীপে চলে আসেন। তৎকালীন ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা।
- ডাকসুর ভিপি ও গণ-আন্দোলন: ১৯৬৮-৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে তিনি ডাকসুর (DUCSU) ভিপি হিসেবে ছাত্রসমাজকে নেতৃত্ব দেন।
- ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক: তৎকালীন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে তার আপসহীন নেতৃত্ব দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ।
- মুজিব বাহিনীর প্রধান: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গঠিত ‘মুজিব বাহিনী’ (বিএলএফ)-এর অন্যতম প্রধান হিসেবে বীরত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
- বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে তার রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
বর্ণাঢ্য সংসদীয় ও মন্ত্রীত্ব জীবন
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তোফায়েল আহমেদ একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদীয় রাজনীতির পাশাপাশি তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করেছেন।
ছাত্র আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রাম, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও রূপকার ছিলেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। তার এই অপূরণীয় ক্ষতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের মাঝে শোকের আবহ বিরাজ করছে।



