১৯৯৩ সালে জাতিসংঘে গণতন্ত্র ও পানির অধিকার তুলে ধরেছিলেন খালেদা জিয়া

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে নিজের প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন তৎকালীন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া। উদীয়মান শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর অধিকার সুরক্ষায় জাতিসংঘকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পারস্পরিক সংযোগ জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রদত্ত সেই ঐতিহাসিক ভাষণে খালেদা জিয়া উল্লেখ করেন, “গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, দারিদ্র্য মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা দূর করার ওপরই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। উন্নয়নশীল দেশে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে বিকশিত করতে উন্নত বিশ্বের সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।

গঙ্গার পানি সংকট ও ফারাক্কা ইস্যু ভাষণের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত পানিবণ্টন সমস্যা। ভারতের সাথে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জানান, এসব নদীর পানিসম্পদের ওপর বাংলাদেশের ‘অন্তর্নিহিত ও আইনগত অধিকার’ রয়েছে।

ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশে খরা দেখা দেয় এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে বন্যা সৃষ্টি করা হয়। ফারাক্কা বাঁধকে বাংলাদেশের জন্য ‘জীবন-মরণ সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি গঙ্গার পানিসম্পদের ন্যায্য ও স্থায়ী চুক্তির জরুরি আহ্বান জানান।

পরিবেশ রক্ষা ও পাটশিল্প বিশ্ব পরিবেশ দূষণের জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলোকে প্রধানত দায়ী করে তিনি বলেন, পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক ব্যয় তাদেরই বহন করা উচিত। পাশাপাশি রাসায়নিক পণ্যের বিপরীতে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে বাংলাদেশের পাটশিল্পের ঐতিহ্য ও পরিবেশগত গুরুত্বের বিষয়টি বৈশ্বিক দরবারে তুলে ধরেন।

বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন কেবল বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর না করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে উন্নত দেশগুলোকে বৈষম্যমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থা দূর করার আহ্বান জানান সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের ওপর গুরুত্ব দেন। বক্তব্যে তিনি তৎকালীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রগতি—যেমন ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি, খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা, মৌলিক পুষ্টির জন্য ‘ডাল-ভাত’ কর্মসূচি এবং সার্কের আওতায় আঞ্চলিক সহযোগিতার রূপরেখা তুলে ধরেন।

শরনার্থী সংকট ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশের আশ্রয় দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সমর্থন চান খালেদা জিয়া। এছাড়া বসনিয়া-হার্জেগোভিনার জাতিগত নিপীড়নের নিন্দা, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সমর্থন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন তিনি।

জিয়া পরিবারের ত্রিপক্ষীয় জাতিসংঘ অধ্যায় উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান প্রথমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়া বক্তব্য রাখেন। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মাধ্যমে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার চার দশকের এক অনন্য ধারাবাহিকতা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।

সর্বশেষ