কাজী নজরুল ইসলাম—যিনি জনসভায় গান গেয়ে, কবিতা আবৃত্তি করে প্রার্থীদের পক্ষে জনসমর্থন আদায় করতেন—একসময় মনে করলেন, তিনি নিজেই প্রার্থীদের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। স্টেজে উঠলেই মানুষের উচ্ছ্বাস তাকে ভাবতে বাধ্য করল: অন্যের হয়ে আর কতদিন ভোট চাইবেন? তিনি নিজেই দাঁড়িয়ে গেলেন নির্বাচনে।
সমগ্র ঢাকা বিভাগে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত আসন ছিল দুটি। পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে তিনজনই ছিলেন প্রভাবশালী জমিদার—ইসমাইল হোসেন চৌধুরী, আব্দুল হালিম গজনভি ও খাজা আব্দুল করিম। বাকি দুজন—মফিজউদ্দীন আহমদ এবং দারিদ্র্যে জর্জরিত ‘দুখু মিয়া’, কাজী নজরুল ইসলাম।
নির্বাচনে দাঁড়ানোর কয়েক মাস আগে নজরুল তার সন্তানের ক্ষুধার্ত অবস্থার কথা জানিয়ে প্রকাশককে ২৫ টাকা ধার করে পাঠাতে বলেছিলেন। সেই দারিদ্র্যই জন্ম দিয়েছিল তার বিখ্যাত কবিতা ‘দারিদ্র্য’। এমন আর্থিক অবস্থায় বিধানচন্দ্র রায়ের দেওয়া মাত্র ৩০০ টাকা নিয়েই নজরুল নেমে পড়েন নির্বাচনী লড়াইয়ে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম—ঢাকা বিভাগের মোট ভোটার মাত্র ১৮,১১৬ জন, এবং তাদের বেশিরভাগই তুলনামূলক স্বচ্ছল। যারা নজরুলকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, তাদের অনেকেই ভোটারই ছিলেন না। ওপরন্তু ‘বিদ্রোহী’সহ কয়েকটি লেখার কারণে রক্ষণশীল সমাজের একটি অংশ তাকে ‘কা’ফের’ বলেও সমালোচনা করত।
জনমতের সেই বাধা ভাঙতে নজরুল নিজেই যান ফরিদপুরের প্রভাবশালী পীর বাদশাহ মিয়ার কাছে। পীর তার পক্ষে ফতোয়া লিখে দেন—মুসলিম সমাজে ভোট পাওয়ার উদ্দেশ্যে এটি ছিল নজরুলের বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক কৌশল। তার প্রচারণায় সঙ্গ দেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। দুই কবি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাতেন—নজরুলের নীতি ছিল, “চায়ে কোনো না নেই”, দিনে একবারে ৭২ কাপ চা খেয়ে ফেলেন!
নির্বাচনের কৌশলে জসীমউদ্দীনের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি ভোটকেন্দ্রে বসে থাকেন—মানুষ তাকে দেখলে হয়তো ভোট দেবে। কিন্তু ফলাফল ছিল হতাশাজনক।
নির্বাচনের ফলাফল:
১. ইসমাইল হোসেন খান চৌধুরী — ৬০৬১ ভোট (বিজয়ী)
২. আব্দুল হালিম গজনভি — ৫৭৬৯ ভোট (বিজয়ী)
৩. আব্দুল করিম — ২০৪৩ ভোট
৪. কাজী নজরুল ইসলাম — ১০৬২ ভোট (জা’মানত বাজেয়াপ্ত)
৫. মফিজউদ্দীন আহমদ — ৫২০ ভোট (জা’মানত বাজেয়াপ্ত)
অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি হয়েও নির্বাচনে করুণভাবে পরাজয় নজরুলকে বুঝিয়ে দেয়—সাহিত্যিক জনপ্রিয়তা আর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার পার্থক্য বিশাল। আর কখনো তিনি নির্বাচনের পথে পা বাড়াননি।



