দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বিরল কূটনৈতিক সৌজন্য দেখিয়ে বিমানবন্দরে গিয়ে নিজ হাতে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দিল্লি বিমানবন্দরের রানওয়েতে করমর্দনের পর আলিঙ্গন করে দুই নেতা নয়াদিল্লি–মস্কো সম্পর্কের উষ্ণতার সংকেত দেন।
⭐ প্রটোকল ভেঙে মোদীর অভ্যর্থনা
সাধারণ নিয়মে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে স্বাগত জানানোর দায়িত্ব থাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। কিন্তু এবার প্রটোকল ভেঙেই পুতিনকে অভ্যর্থনা জানাতে যান মোদী। বিমানবন্দর থেকে একই গাড়িতে রওনাও হন দুজন। এই দৃশ্যই ইঙ্গিত দেয়—পুতিনের এ সফর ভারতের কাছে কতটা গুরুত্ব বহন করছে।
সফরে পুতিন যোগ দেবেন ২৩তম ভারত–রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ বৈঠকে। পাশাপাশি হায়দরাবাদ হাউজে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হতে পারে, যার মধ্যে অন্যতম এস–৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়।
⭐ রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ পাবে ভারত
পুতিনের সফরের আগমুহূর্তেই রাশিয়ার পার্লামেন্ট অনুমোদন দিয়েছে বিশেষ সামরিক চুক্তি ‘রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অব লজিস্টিক সাপোর্ট’ (RELS)–কে। এই চুক্তি অনুযায়ী—
- ভারত রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে
- রণতরী, ডুবোজাহাজ, যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সুযোগ
- জ্বালানি, গোলাবারুদ, রসদ, মেরামত–সংক্রান্ত সব সুবিধা নিতে পারবে ভারতীয় বাহিনী
শুধু রাশিয়াই নয়—তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তানসহ যেসব দেশে রুশ ঘাঁটি আছে, সেগুলোও ব্যবহার করতে পারবে ভারত।
⭐ তেল, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল ভোক্তা।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার তেল কম দামে পাওয়ায় ভারতের আমদানি ২.৫% থেকে বেড়ে ৩৫%–এ পৌঁছেছে।
এটি ভারতের জন্য সুবিধা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের।
ওয়াশিংটনের দাবি—ভারত রুশ তেল কিনে ক্রেমলিনের যুদ্ধ তহবিলকে শক্তিশালী করছে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫% শুল্ক আরোপও করেছে। এর পর থেকে ভারত তেল আমদানি কমিয়েছে। পুতিন এ সফরে চাবি ঘোরাতে চাইবেন—ভারত যেন আবার ক্রয়াদেশ বাড়ায়।
রাশিয়ার কাছে ভারতের আকর্ষণ:
- ১.৫ বিলিয়ন জনসংখ্যার বাজার
- ৮%-এর বেশি প্রবৃদ্ধি
- দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি
- প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘ সহযোগিতা
⭐ অস্ত্রবাণিজ্যে রাশিয়ার বড় লক্ষ্য
সোভিয়েত যুগ থেকেই ভারতের প্রধান অস্ত্র রপ্তানিকারক রাশিয়া।
পুতিনের সফরের আগে থেকেই খবর—
- ভারত উন্নত রুশ যুদ্ধবিমান
- বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
- নতুন সামরিক প্রযুক্তি
কিনতে আগ্রহী।
রাশিয়ার শ্রম বাজার সংকট মোকাবিলায় ভারতের দক্ষ কর্মীশক্তিকেও অত্যন্ত মূল্যবান মনে করছে মস্কো।
⭐ ইউক্রেন যুদ্ধেও রাশিয়ার ‘মিত্রতা বার্তা’
চীন সফরে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের মতোই এবার মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেও পুতিন দেখাতে চান—
“রাশিয়া একা নয়, পশ্চিমা চাপ সত্ত্বেও বড় বড় মিত্র এখনো পাশে আছে।”
এই জ্বালানি–রাজনীতি, সামরিক বাণিজ্য এবং ভূ–রাজনৈতিক বার্তা একই সঙ্গে দিচ্ছেন পুতিন।
⭐ মোদীর ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর পরীক্ষা
ভারত রাশিয়া–যুক্তরাষ্ট্র—দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চায়।
মোদীর এ কৌশলকে বলা হয় Strategic Autonomy।
কিন্তু—
- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক–বাণিজ্য টানাপড়েন
- ইউরোপের চাপ
- রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
এই সবকিছুই মোদীর কূটনৈতিক ভারসাম্যকে কঠিন করে তুলেছে।
পুতিনের সফর তাই ভারতের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ, আবার পরীক্ষা।
⭐ ভারত–রাশিয়া বাণিজ্যের লক্ষ্য ১০০ বিলিয়ন ডলার
২০২০ সালে দুই দেশের বাণিজ্য ছিল মাত্র ৮.১ বিলিয়ন USD।
২০২৫–এর মার্চ শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৬৮.৭২ বিলিয়ন USD—যার বড় অংশই রাশিয়ার তেল বিক্রি।
এখন দিল্লি–মস্কো চায়—
👉 ২০৩০ সালের মধ্যে বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন USD–এ পৌঁছানো
👉 তেল ছাড়া অন্যান্য খাতে বাণিজ্য বাড়ানো
👉 প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় অংশীদারিত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, দুই মিত্র দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এত বছরেও প্রত্যাশিত পর্যায়ে ওঠেনি—পুতিনের এ সফর সেই দিক পরিবর্তনের সুযোগ এনে দিতে পারে।
⭐ শেষ কথা
পুতিনের এই ভারত সফর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়—
এটি এশিয়া–ইউরোপ–আমেরিকার মধ্যকার ভূ–রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
মোদী ও পুতিনের সম্পর্ক নতুন বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা চুক্তি, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে অবস্থান–চিত্র নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।



