ভারতে প্রথমবারের মতো হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন চালু, উদ্বোধন করলেন মোদি

১৭ জুলাই ২০২৬

ভারতে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হলো। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করলেন ভারতের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন। চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরি (ICF) দ্বারা নির্মিত এই পরিবেশবান্ধব ট্রেনটি চালুর মাধ্যমে বিশ্বের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হলো ভারত।

রুট ও পরিচালনা

ট্রেনটি উত্তর রেলওয়ের দিল্লি ডিভিশনের আওতাধীন হরিয়ানার জিন্দ এবং সোনিপতের মধ্যে ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটে চলাচল করবে। যাত্রা পথে এটি পান্ডু পিন্দারা জংশন, ললিত খেরা হল্ট, ভামভেওয়া, ইসাপুর খেরি হল্ট, বুটানা হল্ট, খান্দরাই হল্ট, রাবরাহ হল্ট, লাথ হল্ট, মোহানা এবং বারওয়াসনি হল্ট স্টেশনে থামবে।

রেল বিভাগ জানিয়েছে, এই পাইলট রুটে সাফল্য এলে পরবর্তী সময়ে হরিয়ানার কালকা থেকে হিমাচল প্রদেশের শিমলা রুটেও এই হাইড্রোজেন ট্রেন চালু করা হতে পারে। এর আগে গত ২২ মে ইন্ডিয়ান রেল বোর্ড (আইআরবি) এই ব্রডগেজ ট্রেনটিকে যাত্রী পরিবহণের জন্য অনুমোদন দেয়, যা বিশ্বের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন ট্রেন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

গতি ও ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা

এই বিশেষ ট্রেনে রয়েছে দুটি হাইড্রোজেন ড্রাইভিং পাওয়ার কার এবং আটটি ট্রেলার কোচ। ট্রেনের দুই প্রান্তে থাকা পাওয়ার কার দুটির প্রতিটি ১৬০০ অশ্বশক্তি (১২০০ কিলোওয়াট) ক্ষমতা উৎপন্ন করতে পারে। সম্মিলিতভাবে এগুলো ট্রেনটিকে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার গতিতে চালাতে সক্ষম। প্রতিটি পাওয়ার কারে ফুয়েল সেল, লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারি এবং হাইড্রোজেন সংরক্ষণ সিলিন্ডার রয়েছে, যা যেকোনো পরিস্থিতিতে ট্রেনের নির্ভরযোগ্য পরিচালনা নিশ্চিত করে।

যেভাবে কাজ করে এর প্রযুক্তি

হাইড্রোজেনচালিত এই ইঞ্জিনের মূল ভিত্তি হলো পানি ও বিদ্যুৎ।

  • প্রথম ধাপ: গ্রিন হাইড্রোজেন প্ল্যান্টে ইলেক্ট্রোলাইসিস পদ্ধতিতে পানি থেকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পৃথক করা হয়।
  • দ্বিতীয় ধাপ: উৎপাদিত হাইড্রোজেনকে ৫০০ বার চাপে সংকুচিত করে নিরাপদ ট্যাংকে রাখা হয়।
  • তৃতীয় ধাপ: ৩৫০ বার নিয়ন্ত্রিত চাপে ডিসপেনসারের মাধ্যমে ট্রেনের পাওয়ার কারে জ্বালানি ভরা হয়।

এই প্রকল্পের পাইলট রুট হিসেবে জিন্দে দেশীয় প্রযুক্তিতে একটি হাইড্রোজেন সংরক্ষণ ও রিফুয়েলিং কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে একসঙ্গে প্রায় ৩০০০ কেজি হাইড্রোজেন সংরক্ষণ করা সম্ভব। এই কেন্দ্রটির প্রয়োজনীয় লাইসেন্স দিয়েছে পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস সেফটি অর্গানাইজেশন।

পরিবেশের ওপর প্রভাব

হাইড্রোজেনকে বিশ্বের অন্যতম ‘পরিচ্ছন্ন জ্বালানি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেন থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে ট্রেন চলে। ফলে কোনো ক্ষতিকর গ্যাস বা ধোঁয়া নির্গত হয় না, উপজাত হিসেবে শুধু জলীয় বাষ্প বের হয়। কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকায় এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা

হাইড্রোজেন অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় পুরো সিস্টেমে সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

  • লিক ও ফায়ার ডিটেকশন: ট্রেন এবং প্ল্যান্টের প্রতিটি অংশে সার্বক্ষণিকভাবে হাইড্রোজেন লিক, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, আগুন ও ধোঁয়া শনাক্তকরণের বিশেষ যন্ত্র রয়েছে।
  • স্বয়ংক্রিয় শাটডাউন: কোনো ধরনের ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাইড্রোজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে।
  • জরুরি মোড: লোকো পাইলটের কেবিন বিশেষভাবে সুরক্ষিত এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ট্রেন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ মোড রয়েছে।

এই পুরো ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নকশা অনুমোদন করেছে রিসার্চ ডিজাইনস অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন। মেসার্স মেধা সার্ভো ড্রাইভস ট্রেনসেটের সমন্বয় এবং জার্মানভিত্তিক শীর্ষ সার্টিফিকেশন সংস্থা ‘টিইউভি এসইউডি’ এর স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের নিরাপত্তা মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছে।

সর্বশেষ