শিল্পে নতুন গ্যাস–সংযোগ আপাতত বন্ধ, সরবরাহ বাড়লে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সংযোগ

২৮ জুলাই ২০২৬

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া এবং এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির সীমাবদ্ধতার কারণে আপাতত শিল্পে নতুন গ্যাস–সংযোগ দিচ্ছে না সরকার। বিদ্যমান সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও সার কারখানাগুলো নিয়মিত গ্যাস–স্বল্পতায় ভুগছে। এ অবস্থায় নতুন সংযোগের পরিবর্তে বিদ্যমান সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

শিল্পে নতুন সংযোগ আপাতত বিবেচনায় নয়

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গত ১৪ জুলাই বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এবং বর্তমানে মাত্র দুটি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) নির্ভর এলএনজি আমদানির সীমাবদ্ধতার কারণে আপাতত শিল্পে নতুন গ্যাস–সংযোগের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে না।

কক্সবাজারের মহেশখালীতে সমুদ্রে ভাসমান দুটি এফএসআরইউ থেকে সর্বোচ্চ ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। সাধারণ সময়ে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়। তবে একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় বর্তমানে সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুটেরও কমে নেমেছে। এর ফলে গত এক সপ্তাহ ধরে দেশের সব খাতেই গ্যাস–সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

নতুন নয় সংযোগ বন্ধের সিদ্ধান্ত

গ্যাস–সংকটের কারণে ২০০৯ সালের ২১ জুলাই থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন গ্যাস–সংযোগ বন্ধ করা হয়। পরে বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনায় কিছু শিল্পে সংযোগ দেওয়া হলেও বিভিন্ন সময় এ–সংক্রান্ত কমিটি গঠন ও বাতিলের ঘটনা ঘটেছে।

সাম্প্রতিক সময়েও অনুমোদিত আবেদনগুলোর মধ্যে অগ্রাধিকার তালিকা তৈরির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তিতাস গ্যাসের ২৫টি সংযোগ অনুমোদন দেওয়া হলেও পরে কমিটিটি বাতিল করা হয়।

এদিকে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৭ মে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শিল্পে গ্যাস–সংযোগ নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

উৎপাদন কমছে, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহেই দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে। নতুন কূপ খনন করেও উৎপাদনের পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। গত এক দশকে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি কমেছে। ২০১৭ সালে দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এরপর থেকেই উৎপাদন নিম্নমুখী।

২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সর্বোচ্চ দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে আমদানি বাড়ানো যাচ্ছে না।

সরবরাহ বাড়াতে সরকারের বিকল্প পরিকল্পনা

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, শিল্পে নতুন সংযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সাময়িক। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকার একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। ভোলার গ্যাস ঢাকায় আনার উদ্যোগের পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির বিষয়েও আলোচনা চলছে।

তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পর অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে নতুন সংযোগ দেওয়া হবে। যেসব গ্রাহক ইতোমধ্যে অনুমোদন নিয়ে ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দিয়েছেন, তাঁদের আগে বিবেচনা করা হবে।

সরবরাহ বাড়াতে সময় লাগবে

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে গ্যাসের অভাবে অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। সার কারখানাগুলোরও অধিকাংশ সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন সংযোগ দিলে বিদ্যমান গ্রাহকদের সরবরাহ আরও কমে যাবে।

তাঁদের মতে, গ্যাস সরবরাহ বাড়তে অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে। তবে জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলেও উৎপাদনে যেতে কয়েক বছর সময় লাগবে এবং আমদানি বাড়ানোর অবকাঠামো তৈরি করতেও অন্তত দেড় বছর প্রয়োজন।

এলএনজি আমদানির সীমাবদ্ধতা

মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির বিষয়ে আলোচনা চললেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণেই প্রায় এক বছর সময় লাগবে। এরপরও দৈনিক মাত্র ১ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে, যা একটি বড় শিল্পকারখানার চাহিদাও পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণই কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নতুন টার্মিনাল ও পাইপলাইন প্রয়োজন

বিদ্যমান দুটি ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি আরও দুটি ভাসমান ও একটি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ থাকলেও গত দেড় বছরে নতুন কোনো টার্মিনাল যুক্ত হয়নি।

এ ছাড়া মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত পাইপলাইনের সক্ষমতা থাকলেও পরবর্তী পাইপলাইনগুলোর ব্যাস ছোট হওয়ায় সেগুলো দিয়ে ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ সম্ভব নয়। ফলে সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণও প্রয়োজন।

চাহিদা পূরণে বাড়তি গ্যাসের প্রয়োজন

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত গ্যাসের ৪১ শতাংশ বিদ্যুৎ খাতে, ৩৬ শতাংশ শিল্পে, ১১ শতাংশ গৃহস্থালিতে, ৬ শতাংশ সার কারখানায়, ৫ শতাংশ সিএনজি খাতে এবং ১ শতাংশ চা শিল্পে ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে বিদ্যমান সরবরাহ বিভিন্ন খাতে সমন্বয় করে পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে প্রতিশ্রুত নতুন সংযোগগুলো কার্যকর করতে হলে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে, যার সংস্থান এখনই সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মত

জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে আমদানির বিকল্প নেই। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি অবকাঠামোও সম্প্রসারণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন পাওয়ার পর ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধ করে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছে, তাদের দীর্ঘদিন সংযোগ না দিলে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দ্রুত সরবরাহ বাড়িয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের গ্যাস–সংকট রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে ১০০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্র ও স্থলভাগে তেল–গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে এবং নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি আমদানির উৎস ও সরবরাহ অবকাঠামো বহুমুখী করার উদ্যোগও চলমান রয়েছে।

সর্বশেষ