দেশের বড় জেলা শহরগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জিপিএস–সুবিধাসম্পন্ন পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও নিয়মিত যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি যানজট এবং পরিবহন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হবে।
এ লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ‘বৃহৎ জেলা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াতব্যবস্থা প্রকল্প’ নামে একটি প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
গত ১৪ জুলাই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত প্রকল্প যাচাই কমিটির সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সভায় প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা আরও বিস্তারিতভাবে যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মাউশি জানিয়েছে, প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রথমে সীমিত পরিসরে একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। পাইলট কার্যক্রম সফল হলে পরে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
মাউশির পরিচালক অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন বলেন, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ২৩ হাজার ৯৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সীমিত পরিবহন সুবিধা থাকলেও স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য এখনো কোনো পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু হয়নি।
ফলে প্রতিদিন সাধারণ গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয় শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা ও ছুটির সময় অতিরিক্ত ভিড়, যানজট, অনিয়মিত যান চলাচল এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্ভোগ বাড়ে।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং যাতায়াতের প্রয়োজন বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়সূচি ও নির্দিষ্ট স্টপেজ অনুসারে বাস চলাচল করবে বলে জানিয়েছে মাউশি।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় জিপিএস–সুবিধাসম্পন্ন ইলেকট্রিক বাস চালুর কথা বলা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন এলাকায় এ সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পাইলট প্রকল্পের ফলাফলের ভিত্তিতে বাসের রুট, ভাড়া ও পরিচালনা–সংক্রান্ত বিষয় চূড়ান্ত করা হবে।
প্রথম ধাপে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, ময়মনসিংহ এবং বগুড়া সিটি করপোরেশন এলাকায় এ সেবা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে।
শিক্ষাবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গণপরিবহন চালু হলে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ও ছোট আকারের ভাড়ার যানবাহনের ব্যবহার কমবে। এতে অভিভাবকদের ব্যয় কমার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন সড়কের যানজটও কমতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে।
তাদের মতে, বড় শহরগুলোতে উদ্যোগটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য শহরেও একই ধরনের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক গণপরিবহন চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে কার্যকর করতে হলে পর্যাপ্ত বাস, বাস্তবসম্মত রুট পরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব ভাড়া নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ সময়োপযোগী ও পরিবেশবান্ধব। তবে শুধু বাস সংগ্রহ করলেই হবে না; প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং খুচরা যন্ত্রাংশের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে ভবিষ্যতে বাসগুলো সচল রাখা কঠিন হতে পারে।



