চাঁদের গতি ও রহস্য বুঝতে গিয়েই যেভাবে ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেন নিউটন

২০ আগস্ট ২০২৬

চাঁদ কেন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে? গ্রহগুলো কীভাবে নির্দিষ্ট পথে ঘোরে? কিংবা কোনো বস্তু উপর থেকে পড়ার সময় তার গতি কীভাবে বদলায়? এসব জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই ২৪ বছর বয়সে গণিতের জগতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন। ১৬৬৫ সালের দিকে তাঁর হাত ধরেই বিকশিত হয় ক্যালকুলাস, যা পরবর্তীতে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের অন্যতম মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।

নিউটনের আগে কোনো বস্তুর পরিবর্তনশীল গতি বা সময়ের সঙ্গে তার পরিবর্তনকে গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করার নিখুঁত কোনো মাধ্যম ছিল না। বিশেষ করে একটি পড়ন্ত বস্তুর গতি প্রতি মুহূর্তে কীভাবে বাড়ছে, সেই গাণিতিক ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়েই নিউটন সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এই গণিতের প্রয়োজন অনুভব করেন।

গতি বুঝতে গিয়ে নতুন গণিতের জন্ম

নিউটন মূলত গতি ও মহাকর্ষ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেন, কোনো বস্তু নিচে পড়ার সময় তার গতি প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়। ঠিক একইভাবে গ্রহ ও চাঁদের গতিও পরিবর্তনশীল।

এই পরিবর্তনের হারকে নির্ভুলভাবে হিসাব করতেই তিনি ক্যালকুলাসের ধারণা গড়ে তোলেন। এর সাহায্যে তিনি শুধু পড়ন্ত বস্তুর গতিই নয়, বরং সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণের কারণে গ্রহগুলোর উপবৃত্তাকার গতিপথও ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হন। তিনি প্রমাণ করেন—পৃথিবীতে কোনো বস্তু নিচে পড়ার পেছনে যে মহাকর্ষ কাজ করে, সেই একই শক্তি চাঁদকে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে সাহায্য করছে।

সহজ কথায় কী এই ক্যালকুলাস?

সহজভাবে বললে, সময়ের সঙ্গে কোনো কিছুর পরিবর্তন কীভাবে ঘটছে, তা জানার গণিতই হলো ক্যালকুলাস। এর প্রধান অংশ দুটি—একটি হলো পরিবর্তনের হার নির্ণয় করা, অন্যটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ যোগ করে মোট পরিমাণ বের করা।

সাধারণ বীজগণিত দিয়ে দুটি বিন্দুর মধ্যে সরলরেখার হিসাব করা গেলেও কোনো রেখা বাঁকা হলে তার প্রতিটি বিন্দুতে পরিবর্তনের হার ভিন্ন হয়। সেই বাঁকা রেখার নির্দিষ্ট বিন্দুতে পরিবর্তনের হার কিংবা বাঁকা অংশের নিচের ক্ষেত্রফল নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতেই ক্যালকুলাস ব্যবহৃত হয়।

বদলে গেছে পুরো বিজ্ঞানের চিত্র

আবিষ্কারের পর ক্যালকুলাসের ব্যবহার শুধু গণিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ছড়িয়ে পড়ে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রকৌশলে। যানবাহনের গতি, শব্দ, আলো, বিদ্যুৎ, প্রকৌশল নকশা থেকে শুরু করে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বে স্থান ও সময়ের পরিবর্তন ব্যাখ্যাতেও ক্যালকুলাস অপরিহার্য।

বিতর্ক ও লাইবনিজের অবদান

ক্যালকুলাসের বিকাশ নিয়ে জার্মান গণিতবিদ গটফ্রিড ভিলহেল্ম লাইবনিজের সঙ্গে নিউটনের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। তবে নিউটন আগে কাজ শুরু করলেও ক্যালকুলাসের বিভিন্ন প্রতীক ও আধুনিক প্রকাশভঙ্গি তৈরিতে লাইবনিজের অবদান অনন্য। পরবর্তীতে তাঁদের যৌথ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ক্যালকুলাস সমৃদ্ধ হয়েছে।

প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী পার হয়ে গেলেও বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় ক্যালকুলাসের গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি। চাঁদ ও গতির রহস্য উদঘাটনে নিউটনের উদ্ভাবিত এই গণিত আজও আধুনিক প্রযুক্তির প্রতিটি পদক্ষেপে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

সর্বশেষ