শাস্তির আওতায় আসছে যাত্রী-পথচারীরাও, আসছে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন

১৮ আগস্ট ২০২৬

সড়কে দুর্ঘটনা রোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। এতদিন শুধুমাত্র চালক ও যানবাহনের মালিকদের আইনি শাস্তির আওতায় আনা হলেও, এবার নতুন আইনে যাত্রী, পথচারী, অভিভাবক ও সড়ক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায় নির্ধারণ করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’-এ এমন যুগান্তকারী ও কঠোর বিধানের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বর্তমানে খসড়া আইনটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। মন্ত্রিসভার সবুজ সংকেত পাওয়ার পর এটি আইন মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাই শেষে সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

যাত্রী ও পথচারীদের জন্য যত জরিমানা ও নিয়ম নতুন আইনের প্রস্তাব অনুযায়ী, ফুটপাত বা নির্ধারিত পারাপারের স্থান ব্যবহার না করে যত্রতত্র চলাচল করলে পথচারীকে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হতে পারে। একই অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে পারেন যাত্রীরাও, যদি তারা:

  • চালককে অতিরিক্ত দ্রুত গাড়ি চালাতে উৎসাহ দেন,
  • ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়িতে ওঠেন,
  • চালচলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে হাত বা মাথা বের করেন, কিংবা
  • নির্ধারিত আসনের বাইরে বসেন।

তবে ফুটপাত দখল মুক্ত করা, পর্যাপ্ত ওভারব্রিজ, জেব্রা ক্রসিং ও সড়কদ্বীপ তৈরির সম্পূর্ণ দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর চাপানো হয়েছে।

শিশু সুরক্ষায় কঠোর বিধিনিষেধ বাইকে শিশু যাত্রী বহনে আনা হচ্ছে বড় পরিবর্তন। ৬ বছরের কম বয়সী শিশুকে মোটরসাইকেলের সহযাত্রী হিসেবে নেওয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। এছাড়া:

  • লাইসেন্স ছাড়া কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ককে গাড়ি বা বাইক চালাতে দিলে অভিভাবক বা মালিক দায়ী হবেন।
  • ১৩৫ সেন্টিমিটারের কম উচ্চতা বা ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে মোটরযানের সামনের আসনে বসানো যাবে না।
  • শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘চাইল্ড রিস্ট্রেইন্ট সিস্টেম’ বা বিশেষ নিরাপত্তা আসন ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

গতিসীমা, ওভারটেকিং ও শাস্তির প্রস্তাব নতুন খসড়ায় গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিড ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় স্পিড ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে।

  • গতিসীমা: জাতীয় পর্যায়ে মোটরযানের সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার এবং শহর এলাকায় ৪০ কিলোমিটার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
  • ওভারটেকিংয়ে নিষেধাজ্ঞা: পথচারী পারাপারের স্থান, মোড় ও রেলক্রসিংয়ের ৫০ মিটারের মধ্যে ওভারটেকিং নিষিদ্ধ। এছাড়া কুয়াশা, বৃষ্টি বা ধুলায় দৃষ্টিসীমা কমে গেলে ওভারটেকিং করা যাবে না।
  • শাস্তি: এক হাতে স্টিয়ারিং চালানো কিংবা ক্লান্ত/ঝিমুনি অবস্থায় গাড়ি চালালে প্রথমবার সর্বোচ্চ ১ মাস কারাদণ্ড, ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। সেই সঙ্গে চালকের ১ পয়েন্ট কাটা যাবে।

মদ্যপান পরীক্ষা ও ফিটনেস প্রযুক্তি মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো শনাক্ত করতে চালকের রক্ত বা নিঃশ্বাস পরীক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে। চালক পরীক্ষা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সর্বোচ্চ ৩ মাস কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া গাড়িতে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন—এয়ারব্যাগ, স্পিড গভর্নর, জিপিএস ট্র্যাকার, ড্যাশ ক্যামেরা ও অটোমেটিক ইমার্জেন্সি ব্রেকিং যুক্ত করা বাধ্যবাধকতার তালিকায় রাখা হয়েছে।

মালিক ও সড়ক নির্মাণকারী সংস্থাও ছাড় পাবে না গাড়ির ফিটনেস, রুট পারমিট, চালকদের ওভারটাইম এবং চালক-কর্মীদের নিয়োগপত্র না দেওয়ার মতো বিষয়ে মালিকদের দায়ী করা হবে। একইভাবে, সড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশা বা নিম্নমানের নির্মাণের জন্য নির্মাতা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ন্যূনতম ১ লাখ টাকা জরিমানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ মতামত বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এই নতুন আইনটি। তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; নিরাপদ ফুটপাত, আধুনিক যানবাহন, প্রযুক্তি ব্যবহার ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে নতুন এই আইনের সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

সর্বশেষ