১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পুলিশে কইছে সরকার আনবে, কিন্তু কবে আনবে তা তো কয় না

৮ জানুয়ারি ২০২৬

‘ছেলের কথা ভুলতে পারি না। ওই ছেলেই তো আমাকে খাওয়াইছিল। এখন আল্লাহ জানেন সে কেমন আছে। শুনেছি ভারতে আছে। একসঙ্গে যারা নিখোঁজ হয়েছিল, তাদের মধ্যে ১৭ জন এখনো সেখানে রয়েছে। যদি সরকার দ্রুত এনে দিত, তাহলে মনটা একটু শান্তি পেত। আমাদের তো আর সেই শক্তি নেই যে নিজেরা গিয়ে ফিরিয়ে আনব। ছেলের কথা মনে হলে মনে হয় সব শেষ হয়ে গেছে। ভুলে থাকা যায় না। পুলিশ বলেছে সরকার আনবে, কিন্তু কবে আনবে—সে কথা কেউ বলে না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব কথা বলছিলেন সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া বরগুনার জেলে ইউনুস সর্দারের মা তারাবানু। প্রায় দুই বছর আগে ঘূর্ণিঝড় মিধিলির সময় ইউনুস সর্দারসহ বরগুনার বিভিন্ন এলাকার ১৭ জন জেলে নিখোঁজ হন। ঘটনার পর থেকেই তাদের খোঁজে বিভিন্ন দপ্তরে ছুটে বেড়ান নিখোঁজ জেলেদের স্বজনরা।

সম্প্রতি স্বজনরা জানতে পারেন, ইউনুস সর্দারসহ নিখোঁজ ১৭ জন জেলে ভারতের গুজরাটের একটি কারাগারে আটক রয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ জেলেদের ফিরিয়ে আনতে পুলিশ তাদের ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর ‘এফবি এলাহী ভরসা’ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলার নিয়ে ১৭ জন জেলে বঙ্গোপসাগরে যাত্রা করেন। মাছ ধরার সময় তারা ঘূর্ণিঝড় মিধিলির কবলে পড়ে নিখোঁজ হন। ওই ১৭ জনের মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের মরখালী, খাগবুনিয়া ও কদমতলা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন আউয়াল বিশ্বাস, মাহাতাব, ইউনুস সর্দার, আল-আমীন, কামাল, ফারুক মিস্ত্রি, খালেক ও নান্টু মিয়া।

এছাড়া একই উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নের গাজী মাহমুদ, নাচনা পাড়া এলাকার সিদ্দিক মৃধা, মনির হোসেন, সহিদুল ইসলাম, খলিল, রব, লিটন ও সুবাহান খাঁসহ মোট ১৫ জন জেলে নিখোঁজ হন। পাথারঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ও বড়ইতলা এলাকার শফিকুল ইসলাম ও কালু মিয়া নামের আরও দুই জেলে ওই ট্রলারে ছিলেন। দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় তাদের কোনো খোঁজ না মিললেও সম্প্রতি তারা ভারতের গুজরাটের একটি কারাগারে আছেন বলে জানতে পারেন স্বজনরা।

ঘূর্ণিঝড় মিধিলিতে নিখোঁজ জেলেদের মধ্যে ইউনুস সর্দারসহ পাঁচজনের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের মরখালী এলাকায়। সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শুধু ইউনুস সর্দারের পরিবার নয়—নিখোঁজ অন্য জেলেদের স্বজনরাও প্রিয়জনদের ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর সন্ধান পাওয়ার খবরে তাদের চোখেমুখে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও উদ্বেগ কাটেনি।

স্বজনদের দাবি, সরকারি উদ্যোগ ছাড়া নিখোঁজ জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এ কারণে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

মরখালী এলাকার নিখোঁজ জেলে আউয়াল বিশ্বাসের স্ত্রী নার্গিস বলেন, ‘দুই বছর আগে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে আমার স্বামী নিখোঁজ হন। অনেক জায়গায় খোঁজ নিয়েও কোনো খবর পাইনি। এখন থানার মাধ্যমে জানতে পারছি, তারা জীবিত এবং ভারতের গুজরাটে আছে। সরকারের কাছে অনুরোধ, যেন দ্রুত তাদের ফিরিয়ে আনা হয়।’

একই এলাকার নিখোঁজ জেলে মাহাতাবের স্ত্রী খাদিজা বেগম বলেন, ‘স্বামী নিখোঁজ হওয়ার সময় আমরা ঋণে ডুবে ছিলাম। দুই বছর ধরে মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। নিখোঁজের তিন মাস পর একটি নম্বর থেকে ফোন এসেছিল, কিন্তু তখন বলা হয় সেটি ভুয়া। এখন থানাই জানাচ্ছে ১৭ জন জেলের সন্ধান মিলেছে।’

নিখোঁজ জেলে ইউনুস সর্দারের ভাই ইদ্রিস বলেন, ‘দীর্ঘদিন কোথাও কোনো তথ্য পাইনি। কিছুদিন আগে সাবেক চেয়ারম্যান আমাদের জানান যে খোঁজ পাওয়া গেছে। এরপর থানায় গিয়ে কথা বলি। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আমরা চাই, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

এ বিষয়ে ঢলুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মোস্তফা কামাল টিটু বলেন, ঘূর্ণিঝড় মিধিলির সময় বঙ্গোপসাগরে তার এলাকার একটি মাছ ধরার ট্রলার নিখোঁজ হয়। ট্রলারটিতে মাঝি আউয়াল বিশ্বাসসহ মোট ১৭ জন জেলে ছিলেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানেও তাদের সন্ধান মেলেনি। সম্প্রতি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের ডিএসবি শাখা থেকে নিখোঁজ জেলেদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে জানা যায়, তারা ভারতের গুজরাটে আটক রয়েছেন। এরপর বিষয়টি পরিবারগুলোকে জানানো হয়।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকায় জেলে পরিবারগুলো মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিলে তারা ফিরে আসতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বরগুনা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার জেলা ইন্টেলিজেন্স অফিসার (ওয়ান) মো. কামরুজ্জামান জানান, মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প থেকে ঘূর্ণিঝড় মিধিলিতে নিখোঁজ ১৭ জন জেলের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। সেই তালিকা অনুযায়ী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং নিখোঁজদের ছবি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে ঢাকার এসবি শাখায় পাঠানো হয়েছে।

বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন জানান, নিখোঁজ জেলেদের বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

সর্বশেষ