আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ সহায়তার কথা জানান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস; বডি ক্যামেরা, সিসিটিভি ও কেন্দ্রীয় কন্ট্রোলরুম ব্যবহারের নির্দেশ
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন ভবিষ্যতের জন্য একটি আদর্শ নির্বাচন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়—সে লক্ষ্যে সর্বোচ্চ প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব এবং এ নির্বাচন জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বুধবার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসংক্রান্ত গণভোট সামনে রেখে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মূল কমান্ড থাকবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে। এবারের নির্বাচনে প্রচলিত চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের দিন যেন কোথাও কোনো ঘাটতি না থাকে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে আমাদের ধাপে ধাপে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আজ থেকে শুরু, ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল। এই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাই সবচেয়ে বড় নির্দেশ। সবাইকে ইসির নির্দেশনা মেনে একযোগে কাজ করতে হবে।’
প্রধান উপদেষ্টা জানান, এবারের নির্বাচনে বডি ক্যামেরা ও সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে এবং কেন্দ্রীয় কন্ট্রোলরুম থেকে সার্বিক পরিস্থিতি মনিটর করা হবে। বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি যেন না থাকে, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি।
বিদেশি পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের উপস্থিতির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এবার দেশি-বিদেশি বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক আসছেন। তাঁরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। আমাদেরও সুপার সিরিয়াস থাকতে হবে।’
সভায় নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানান, নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল অংশ নিচ্ছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬টি দেশের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ৩০০ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল পাঠাতে পারে, যার মধ্যে ৫৬ জন ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছেছেন।
ইসি সচিব বলেন, সাইবার স্পেসে তথ্য বিকৃতি এবারের নির্বাচনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দলীয় প্রতীকের ব্যালট, গণভোটের ব্যালট ও পোস্টাল ব্যালট গণনায় কিছুটা সময় বেশি লাগতে পারে। এসব বিষয়ে বিভ্রান্তি ও গুজব ঠেকাতে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, নির্বাচনের দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে তাঁর মন্ত্রণালয় কাজ করছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, ভোটের দিন সব কেন্দ্রে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা চালু রাখতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া ৩ হাজার ৬১৯টি অস্ত্রের মধ্যে ২ হাজার ২৫৯টি উদ্ধার করা হয়েছে, যা মোট লুটকৃত অস্ত্রের ৬২.৪ শতাংশ। তিনি বলেন, সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ জানান, এবারের নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র আনসার সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে দায়িত্ব পালন করবেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারবেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গণি জানান, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে বডি ক্যামেরা পৌঁছে যাবে এবং প্রয়োজনে ড্রোন ব্যবহার করা হবে।
তিনি বলেন, ভোটের চার দিন আগে সব বাহিনী মোতায়েন করা হবে এবং ভোটের পর আরও সাত দিন মাঠে থাকবে।
বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের সব ৩০০ আসনেই একযোগে ভোট হবে। পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসন নিয়েও আর কোনো অনিশ্চয়তা নেই। বুধবার মধ্যরাত থেকে পোস্টাল ব্যালট ছাপা শুরু হয়েছে, যা বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পূর্ণমাত্রায় চলবে।



