বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপ-চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, রাশিয়া কোনও বৈশ্বিক সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়।
সোমবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মেদভেদেভ। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক তীব্র সংঘাতের মুখে পড়ে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, চলমান ইউক্রেন যুদ্ধটি স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত। যদিও যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূতরা দফায় দফায় আলোচনায় যুক্ত রয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের উদ্যোগের প্রশংসা করে মেদভেদেভ বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ শুরু হওয়াটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলোর কড়া সমালোচনা করেন। মেদভেদেভের ভাষায়, পশ্চিমা শক্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার নিরাপত্তা ও স্বার্থকে উপেক্ষা করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে তা পারমাণবিক বিপর্যয়ের দিকে গড়াতে পারে।
মস্কোর বাইরে নিজ বাসভবনে রয়টার্স, রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা তাস এবং সামরিক বিশ্লেষণধর্মী ব্লগ ওয়ারগনজোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেদভেদেভ বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সহনশীলতার সীমা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মেদভেদেভ বলেন, “আমরা পাগল নই। আমরা বিশ্বযুদ্ধ চাই না। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বৈশ্বিক সংঘাতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রুশ পররাষ্ট্রনীতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা পুতিনের হাতেই থাকলেও, মেদভেদেভ বর্তমানে রাশিয়ার কট্টরপন্থী অভিজাত শ্রেণির মনোভাবের প্রতিফলন ঘটান।
সাক্ষাৎকারের কক্ষে টাঙানো একটি কার্টুনেও সেই কট্টর অবস্থানের ইঙ্গিত দেখা যায়। সেখানে সেন্ট পিটার্সবার্গের বাসিন্দা সাবেক আইনজীবী মেদভেদেভকে ইউরোপীয় নেতাদের দিকে সাবমেশিনগান তাক করে থাকতে দেখা যায়।
ইউক্রেন ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকি নিয়ে পুতিন ও ট্রাম্প উভয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মতে, মস্কো কৌশলগতভাবে উত্তেজনার আশঙ্কা তুলে ধরে ইউক্রেনের মিত্রদের সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো থেকে নিরুৎসাহিত করতে চাইছে।
মেদভেদেভ বলেন, অনেকেই দাবি করে থাকেন রাশিয়া শুধু ভয় দেখাচ্ছে এবং বাস্তবে কিছুই করবে না। তবে ইউক্রেনে পরিচালিত ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ই প্রমাণ করে, রাশিয়া নিজের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পিছপা হয় না।
অন্যদিকে, ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা এই যুদ্ধকে রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী ভূখণ্ড দখলের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। তাদের আশঙ্কা, ইউক্রেনে সাফল্য পেলে ভবিষ্যতে ন্যাটোর দিকেও আগ্রাসন চালাতে পারে মস্কো। যদিও রাশিয়া এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
২০১৪ সালে ইউক্রেনের মাইদান আন্দোলনের মাধ্যমে রাশিয়াপন্থী সরকার পতনের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার সূত্রপাত। এর পর ক্রিমিয়া দখল এবং পূর্ব ইউক্রেনে রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি প্রসঙ্গে মেদভেদেভ বলেন, সব মিলিয়ে সেই সময়টা ছিল অতিমাত্রায় অস্থির।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, যদি কোনও বিদেশি শক্তির মাধ্যমে ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হতো, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেটিকে যুদ্ধের কারণ হিসেবেই বিবেচনা করত।
সূত্র: রয়টার্স



