৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১৮’র আগেই মাদক শুরু ৬০ শতাংশের : আসক্তিতে শীর্ষে ঢাকা, সর্বনিম্ন বরিশাল

২৫ জানুয়ারি ২০২৬

দেশে মাদক সমস্যার ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এনেছে একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণা। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মাদক ব্যবহারকারীর ৬০ শতাংশেরও বেশি ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে। মাদক শুরু করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রভাব হিসেবে উঠে এসেছে বন্ধুদের সঙ্গ ও পরিবেশ। একই সঙ্গে দেখা গেছে, বিভাগভিত্তিক হিসাবে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে এবং সবচেয়ে কম বরিশাল বিভাগে।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাজধানীর শাহবাগে একটি সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে ‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরণ ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। মানক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে।

গবেষণার আওতায় দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলা থেকে মোট ৫ হাজার ২৮০ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে পরিমাণগত ও গুণগত—উভয় ধরনের গবেষণা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে।

গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, বর্তমানে দেশে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। এর মধ্যে তরুণদের অংশ উল্লেখযোগ্য হলেও কিশোর বয়সীদের মধ্যেও মাদক গ্রহণের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।

গবেষণার প্রধান গবেষক, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডীন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হিসেবে গাঁজাই শীর্ষে রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল এবং কোডিনযুক্ত কাশি সিরাপের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে।

তিনি আরও জানান, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর ফলে এইচআইভি, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার দ্রুত ঘটছে। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে ঢাকা বিভাগে মাদকাসক্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এবং বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম।

বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা ও বড় শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে মাদক ব্যবহার ও সরবরাহের ঝুঁকি বেশি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

মাদক গ্রহণের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বন্ধুদের প্রভাব, কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি এবং মানসিক চাপ। গবেষকেরা জানান, সামাজিক পরিবেশ ও সঙ্গদোষের কারণে অনেক কিশোর খুব অল্প বয়সেই মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, মাদকাসক্তদের একটি বড় অংশ কখনোই চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবার আওতায় আসে না। আর যারা চিকিৎসা নেয়, তাদের অনেকেই ধারাবাহিক ও মানসম্মত সেবা পায় না। ফলে পুনরায় মাদক গ্রহণে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে এর সমাধান সম্ভব নয়। এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই প্রতিরোধের পাশাপাশি চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনঃঅন্তর্ভুক্তির কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কিশোর ও তরুণদের লক্ষ্য করে সচেতনতামূলক উদ্যোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ। তারা জানান, এই গবেষণার ফলাফল জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত মাদক নিয়ন্ত্রণ নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সর্বশেষ

৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬