রমজান মাসে শয়তানদের শিকলবন্দি করা হয়—এ বিষয়টি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তা সত্ত্বেও বাস্তবে দেখা যায়, এই পবিত্র মাসেও অনেক মানুষ গুনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—যদি শয়তান বন্দি থাকে, তবে মানুষ পাপে জড়ায় কীভাবে?
রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দি হওয়ার কথা একাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিসে উল্লেখ আছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—রমজান শুরু হলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শিকল পরানো হয়।
তিরমিজির এক বর্ণনায় এসেছে, রমজানের প্রথম রাতেই শয়তান ও অবাধ্য জিনদের বন্দি করা হয়। তখন একজন ঘোষক ঘোষণা দেন—হে কল্যাণের পথের অনুসারীরা, এগিয়ে আসো; আর হে অকল্যাণের অনুসারীরা, থেমে যাও। পাশাপাশি প্রতি রাতেই আল্লাহ বহু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন।
এ ছাড়া মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে নাসাঈতে উল্লেখ রয়েছে, রমজান মাসে বিশেষভাবে ‘মারাদাহ’—অর্থাৎ সবচেয়ে শক্তিশালী ও অবাধ্য শয়তানদের শিকলবন্দি করা হয়।
এখানে প্রশ্ন আসে—সব শয়তানকেই কি বন্দি করা হয়, নাকি নির্দিষ্ট কিছু শয়তানকে?
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। ইমাম ইবনে খুজাইমা উল্লেখ করেছেন, এখানে সব শয়তান নয়; বরং বিদ্রোহী ও শক্তিশালী শয়তানদেরই বোঝানো হয়েছে।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে হাজার আসকালানি ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে কয়েকটি ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। ইমাম হালিমির মতে, যারা আকাশের খবর চুরি করত—মূলত তাদেরই রমজানের রাতগুলোতে বন্দি করা হয়। অন্য আলেমদের মতে, রোজা, কোরআন তিলাওয়াত ও ইবাদতে মুমিনরা বেশি মনোযোগী হওয়ায় শয়তানের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেকের অভিমত হলো, কেবল মারাদাহ শ্রেণির শয়তানরাই শিকলবন্দি হয়।
তবে এরপরও কেন রমজানে গুনাহ দেখা যায়?
এ প্রশ্নের উত্তরে বিখ্যাত তাফসিরকার ইমাম আল-কুরতুবি কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন।
প্রথমত, যারা শর্ত ও আদব মেনে প্রকৃত অর্থে রোজা রাখে, তাদের ক্ষেত্রেই শয়তানের প্রভাব সবচেয়ে কমে যায়। কিন্তু যারা কেবল খাবার ও পানাহার থেকে বিরত থাকে, আত্মশুদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয় না—তাদের জন্য এই সুরক্ষা পূর্ণভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সব শয়তান নয়—শুধু সবচেয়ে শক্তিশালী ও অবাধ্য শয়তানদেরই বন্দি করা হয়।
তৃতীয়ত, গুনাহের উৎস শুধু শয়তান নয়। মানুষের নিজের নফস বা প্রবৃত্তি, দীর্ঘদিনের কু-অভ্যাস এবং মানুষরূপী শয়তান—অর্থাৎ দুষ্ট লোকজনও পাপের পথে প্ররোচিত করে।
শয়তানদের শিকলবন্দি করা কি আক্ষরিক, না রূপক অর্থে?
এ নিয়েও আলেমদের মধ্যে দুই ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে। কাজি ইয়াজসহ একদল আলেম মনে করেন, এটি বাস্তব ও আক্ষরিক অর্থেই ঘটে—আল্লাহ ফেরেশতাদের মাধ্যমে মানুষকে শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন। অন্যদিকে ইবনে আবদুল বারসহ অনেক আলেমের মতে, এটি রূপক অর্থে বলা হয়েছে। অর্থাৎ রমজানে আল্লাহ মুমিনদের বিশেষ রহমত ও সুরক্ষা দান করেন, ফলে শয়তানের প্রভাব কমে যায় এবং গুনাহে জড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ইবনে আবদুল বার বলেন, শয়তানদের শিকলবন্দি করার অর্থ হলো—আল্লাহ মুসলমানদের বড় ধরনের গুনাহ থেকে হেফাজত করেন এবং শয়তান সাধারণ সময়ের মতো সহজে তাদের প্রভাবিত করতে পারে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দি করা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত সত্য। এটি আক্ষরিক হোক বা রূপক—উভয় অবস্থাতেই উদ্দেশ্য একটাই: মানুষের জন্য নেকির পথ সহজ করা এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করা।
তবে মানুষের নফস, অভ্যাস ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের কারণে পাপ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। তাই আলেমদের মতে, রমজানকে শুধু রোজা পালনের মাস হিসেবে নয়, বরং আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির সময় হিসেবে কাজে লাগালেই এই বিশেষ রহমতের পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব।



