পে-স্কেল নিয়ে নানা জল্পনা, বাস্তবায়নে এখনো অনিশ্চয়তা

৩ জুলাই ২০২৬

নতুন অর্থবছর থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত এর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ হয়নি। ফলে বেতন ঠিক কত বাড়বে বা গ্রেডগুলোতে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, তা নিয়ে চাকরিজীবীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক জল্পনা ও অনিশ্চয়তা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত কমিশনের হুবহু সুপারিশ কার্যকর করা হবে, নাকি নতুন করে কোনো সংশোধিত কাঠামো গ্রহণ করা হবে—সে বিষয়েও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে নতুন এই বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

গেজেট প্রকাশের কাজ চলছে

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া রূপরেখা প্রস্তুত করেছে, যার ওপর ভিত্তি করে বর্তমানে চূড়ান্ত গেজেট প্রণয়নের কাজ চলছে। সরকার বর্তমানে বিশ্লেষণ করে দেখছে যে, কত ধাপে এই বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা যায় এবং এর ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির প্রভাব কীভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তাঁর মতে:

  • নতুন পে-স্কেল একসঙ্গে কার্যকর না করে কয়েকটি ধাপে করা হবে।
  • প্রথম ধাপে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন বা বেসিক বাড়ানো হবে।
  • তবে গেজেট ঠিক কবে প্রকাশ হবে বা কোন গ্রেডে কত টাকা বাড়ছে, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানাননি।

এর আগে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে তাঁর বাজেট বক্তৃতায় জানিয়েছিলেন, বিগত প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই কাঠামোতে বেতন পাচ্ছেন। এই দীর্ঘ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো পর্যায়ক্রমে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

চলতি মাসেই গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই এটি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে চলতি মাসের মাঝামাঝি বা শেষ নাগাদ গেজেট প্রকাশের তীব্র সম্ভাবনা রয়েছে। গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও বকেয়াসহ বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।

বেতন কমিশন ২০২৫-এর মূল সুপারিশসমূহ:

উল্লেখ্য, দেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। দীর্ঘ দিন পর সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।

কমিশনের উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবনাগুলো হলো:

  • সর্বনিম্ন মূল বেতন: ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা।
  • সর্বোচ্চ মূল বেতন: ৭৮ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করা।
  • বৈশাখী ভাতা: বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা।
  • ভাতা সংস্কার: ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের যাতায়াত ভাতায় বড় ধরনের সংস্কার।

কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান জানিয়েছিলেন, গত এক দশকের জাতীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সূচকের পরিবর্তনের ভিত্তিতেই এই সুপারিশমালা তৈরি করা হয়েছে। তবে এই বিশাল প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। তবে সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বিবেচনায় রেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সমীচীন হবে।

সর্বশেষ