মজুত বাড়াতে আরও ৫ লাখ টন জ্বালানি তেল কিনছে সরকার

৪ জুলাই ২০২৬

বিশ্ববাজারে চরম অস্থিরতা: দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ৭,৬৭২ কোটি টাকার তেল কিনছে সরকার

অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের চরম অস্থিতিশীলতার মাঝেই দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা, শিল্পোৎপাদন, কৃষিকাজ এবং আকাশপথের যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে আরও প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

৯০ দিনের মজুত নিশ্চিত করার লক্ষ্য

সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে যেকোনো মূল্যে দেশে ৯০ দিনের জ্বালানি তেল মজুত রাখা। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ দিনের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সেই সক্ষমতা বাড়াতেই নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • ডিজেল (গ্যাস অয়েল): ৩ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন।
  • জেট ফুয়েল (উড়োজাহাজের জ্বালানি): ৯০ হাজার মেট্রিক টন।

আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড’ এই জ্বালানি সরবরাহ করবে।

খরচ ও ডলারের হিসাব

সোনালী ব্যাংকের গত ১৩ মে তারিখের ডলারের বিনিময় হার (১ ডলার = ১২৩.২৫ টাকা) অনুযায়ী, জুন-আগস্ট সময়সীমার এই আমদানিতে সম্ভাব্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২ কোটি ২৫ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৬ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং ডলারের মূল্যের পরিবর্তনের কারণে প্রকৃত ব্যয় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। এই আমদানির টাকা বিপিসির নিজস্ব তহবিল এবং প্রয়োজনে ঋণ বা সরকারি সহায়তার মাধ্যমে মেটানো হবে।

দ্রুত শুরু হবে সরবরাহ প্রক্রিয়া

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, সাধারণত প্রতি ছয় মাস পর পর দেশের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে তেল আমদানি করা হয়। জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাসের চাহিদার বিপরীতে বিপিসির পাঠানো প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে এবং প্রশাসনিক ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

বিপিসির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মো. মিজানুর রহমান বলেন, গত ১০ জুন সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে, যার চিঠি ১৭ জুন পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘নোয়া’ (নোটিফিকেশন অব এওয়ার্ড) ইস্যু করা হয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তির পর খুব দ্রুতই তেল সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতি

বিপিসির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার অভাবে জাহাজগুলো দীর্ঘ বিকল্প রুট ব্যবহার করায় ট্রানজিট সময় ও পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি বিমা কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া দাবি করছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়েও ডিজেলের সর্বোচ্চ দর প্রতি ব্যারেল ১৭৮.৯১ ডলার ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল তা রেকর্ড ২৮৪.৯৫ ডলারে পৌঁছায়। গত ফেব্রুয়ারিতে ডিজেলের গড় দর ৮৫.৯৯৭ ডলার থাকলেও এপ্রিলে তা ১১৮.৫০ শতাংশ বেড়ে ১৮৭.৯০৪ ডলার হয়। বর্তমান এই কঠিন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রাপ্ত এই দরটিকে যৌক্তিক মনে করছে বিপিসির দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি।

দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই

জ্বালানি মজুত নিয়ে আশ্বস্ত করে জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি বা সংকটের আশঙ্কা নেই। ডলার সংকটের মধ্যেও এলসি (LC) খোলার ক্ষেত্রে সরকার অগ্রাধিকার দেওয়ায় সরবরাহ চেইন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকবে। এছাড়া, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণে একটি স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাদের স্বস্তি দেবে। যেকোনো পরিস্থিতিতে শিল্প ও কৃষিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর।

সর্বশেষ