দেশের বিস্তীর্ণ সীমান্ত পথ ব্যবহার করে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের মাদকের চোরাচালান। দেশের অন্তত ১৮টি জেলার ১০৫টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ও হেরোইনসহ নানা বিষাক্ত মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আর এসব অবৈধ মাদকের প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সর্বশেষ ‘অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট’ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
তিন প্রধান করিডোর ও পাচারের রুট
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, মূলত তিনটি প্রধান করিডোর দিয়ে দেশে মাদক প্রবেশ করছে। এগুলো হলো—ভারতের সীমান্তবর্তী পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চল এবং মিয়ানমার সীমান্তবর্তী দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল।
- পশ্চিমাঞ্চলীয় করিডোর: সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনী।
- উত্তরাঞ্চলীয় করিডোর: কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা।
- দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় করিডোর: মিয়ানমার সীমান্তবর্তী টেকনাফ, উখিয়া, শাহপরীর দ্বীপ, তুমব্রু, ঘুমধুম, কুতুপালং ও সেন্টমার্টিন দ্বীপ। এসব পয়েন্ট দিয়ে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস) পাচার হয়ে আসছে।
এর মধ্যে কক্সবাজার ও যশোরকে দেশের মাদক চোরাচালানের প্রধান দুটি ‘প্রবেশদ্বার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দারা।
ঢাকাকেই কেন লক্ষ্য বানাচ্ছে পাচারকারীরা?
ডিএনসির তথ্যমতে, সারা দেশে আনুমানিক ৮২ লাখ মাদকাসক্তের মধ্যে কেবল ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ২৩ লাখ। ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ও বিত্তশালী এলাকাগুলোতে মাদকের চাহিদা এবং অর্থের প্রবাহ—দুটিই বেশি। জনসংখ্যা ও টাকার প্রবাহ বেশি থাকায় মাদক কারবারিরা ঢাকাকেই তাদের প্রধান বাজার হিসেবে বেছে নিয়েছে।
প্রযুক্তির ব্যবহার ও নতুন ধরনের ঝুঁকি
চোরাকারবারিরা শুধু প্রচলিত পথেই নয়, বরং কুরিয়ার সার্ভিস, অনলাইন মার্কেটপ্লেস, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ (হোয়াটসঅ্যাপ) এবং সোশ্যাল মিডিয়া (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম) ব্যবহার করে মাদকের কারবার চালাচ্ছে। অর্থ লেনদেনে ব্যবহার করা হচ্ছে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম। এছাড়া পরিবহনে নারী ও শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়াও পেটের ভেতর, জুতা কিংবা গাড়ির টায়ারে লুকিয়ে মাদক বহন করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এলএসডি ও এমডিএমএর মতো ক্ষতিকর কৃত্রিম রাসায়নিক বা সিনথেটিক মাদকের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
জব্দের পরিসংখ্যানে বড় পরিবর্তন
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইয়াবা ও অন্যান্য এমফিটামিন ট্যাবলেট জব্দের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪ কোটি ৩৫ লাখে পৌঁছেছে। তবে হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা ও কোকেন জব্দের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে। দেশে আসা ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের প্রায় ৮০ শতাংশই অভ্যন্তরীণভাবে সেবন করা হয়। বাকি অংশ এবং অন্যান্য কিছু কড়া মাদক ট্রানজিট হিসেবে দেশের বাইরে কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার হয়।
সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ
সীমান্তে নিরাপত্তার ঘাটতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জনবল ও আধুনিক সরঞ্জামের অভাব এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ও অসাধু চক্রের সহায়তার কারণে মাদক কারবার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান সীমান্ত জেলাগুলোর পুলিশ প্রধানরা।
তবে ডিএনসির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন কার্যকর হওয়া আইনের আওতায় নিজস্ব সাইবার ইউনিট, ডগ স্কোয়াড গঠন এবং থানায় পৃথক মাদক ডেস্ক চালুর মাধ্যমে অভিযানের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানোর কাজ চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিহ্নিত রুটগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো ও জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি।



