সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী অন্যতম রহস্যময় এবং অদ্ভুত প্রাণী অক্টোপাস। তিনটি হৃদপিণ্ড, নীল রক্ত আর মুহূর্তে শরীরের রং ও রূপ বদলে ফেলার বিস্ময়কর ক্ষমতার পাশাপাশি প্রজনন ও জীবনচক্রে রয়েছে এদের চোখ কপালে তোলার মতো নানা আচরণ। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ ও ভয়াবহ তথ্যটি হলো— কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে মিলনের পর স্ত্রী অক্টোপাস তার পুরুষ সঙ্গীকেই আক্রমণ করে খেয়ে ফেলে!
যৌন নরখাদকতা বা ‘সেক্সুয়াল ক্যানিবালিজম’:
গবেষণায় দেখা গেছে, সব প্রজাতির অক্টোপাস না করলেও নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে মিলনের পর স্ত্রী অক্টোপাস পুরুষ সঙ্গীটিকে শিকার করে। ২০০৮ সালের এক গবেষণায় মাইক্রোনেশিয়ার পালাউতে অক্টোপাস সায়ানিয়া নামক প্রজাতির ক্ষেত্রে এমন ঘটনা প্রথম নথিভুক্ত হয়। সেখানে মিলনের পর স্ত্রী অক্টোপাসটি একটি ছোট পুরুষ অক্টোপাসকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এবং টানা দুই দিন ধরে তার দেহ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের কারণেই অনেক সময় পুরুষ অক্টোপাস বেশ দূরত্ব বজায় রেখে মিলনের চেষ্টা চালায়।
তিনটি হৃদপিণ্ড ও নীল রক্ত:
অক্টোপাসের শারীরিক গঠনও বৈচিত্র্যময়। এর তিনটি হৃদপিণ্ডের মধ্যে দুটি ফুলকায় রক্ত পাঠায় এবং অন্যটি শরীরের বাকি অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করে। এদের রক্তের রং লাল নয়, বরং নীলচে। হিমোগ্লোবিনের বদলে রক্তে ‘হিমোসায়ানিন’ নামের তামা-সমৃদ্ধ প্রোটিন থাকার কারণে এই নীল রং তৈরি হয়, যা ঠান্ডা ও কম অক্সিজেনযুক্ত পানিতে বাঁচতে সাহায্য করে।
বংশবিস্তারের অনন্য প্রক্রিয়া:
পুরুষ অক্টোপাসের প্রজননের জন্য ‘হেক্টোকোটাইলাস’ নামের একটি বিশেষায়িত বাহু থাকে, যা দিয়ে স্ত্রী অক্টোপাসের শরীরে শুক্রাণু পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রজনন প্রক্রিয়ার শেষটা উভয় সঙ্গীর জন্যই বেশ ট্র্যাজিক। মিলনের কয়েক মাসের মধ্যে পুরুষ অক্টোপাস মারা যায়। অন্যদিকে, স্ত্রী অক্টোপাস ডিম পাড়ার পর থেকে শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং ডিমের কাছে অক্সিজেন পৌঁছে দিতে না খেয়ে একটানা পাহাড়ায় থাকে। গভীর সমুদ্রের একটি প্রজাতির স্ত্রী অক্টোপাসকে টানা ৫৩ মাস ডিম পাহারা দিতে দেখা গেছে। শেষ পর্যন্ত অনাহারেই মা অক্টোপাসটির মৃত্যু ঘটে।
অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও বিবর্তন:
জীবাশ্মের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন বছর আগেও অক্টোপাসের অস্তিত্ব ছিল— অর্থাৎ ডাইনোসরের আবির্ভাবেরও বহু আগে। অক্টোপাসের মস্তিষ্কের পাশাপাশি বাহুগুলোতেও বিপুলসংখ্যক নিউরন বিস্তৃত থাকে, যার ফলে বাহুগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। সমস্যা সমাধান ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে এরা অত্যন্ত চতুর।
ত্বকের বিশেষ কোষ ‘ক্রোমাটোফোর’-এর সাহায্যে এরা মুহূর্তে আশপাশের পাথর বা প্রবালের রং ও টেক্সচার ধারণ করে ছদ্মবেশ নিতে পারে। বিপদের আভাস পেলে কালি ছুড়ে পালানোর সক্ষমতাও রয়েছে এদের।
কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে টিকে থাকা এই অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, রূপ পরিবর্তন এবং রহস্যময় জীবনচক্র অক্টোপাসকে সামুদ্রিক পরিবেশের এক অনন্য প্রাণীতে পরিণত করেছে।



