২১০০ সালের মধ্যেই বিলুপ্ত হতে পারে মানবজাতি

১২ অক্টোবর ২০২৬

চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে মানবজাতির অস্তিত্ব নিয়ে চরম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পারমাণবিক যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহারের মতো মারাত্মক ঝুঁকির কারণে ২১০০ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিট’-এ ‘ল্যানসেট কমিশন অন টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ’ শীর্ষক এই বিশদ প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। ৩৫ জন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে তৈরি এই প্রতিবেদনে আগামী ৭৫ বছরে মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে এমন ১৭টি বড় হুমকির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

এআই, জৈব অস্ত্র ও পারমাণবিক দুর্ভিক্ষের শঙ্কা

প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং জৈব অস্ত্রের (বায়ো-ওয়েপন) সমন্বিত অপব্যবহার নিয়ে বিশ্ববাসীকে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে:

  • এআই ও জৈব অস্ত্র: এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভয়ংকর জৈব অস্ত্র কোটি কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে এবং চরম অবস্থায় পুরো মানবজাতির অস্তিত্ব মুছে দিতে পারে।
  • পারমাণবিক দুর্ভিক্ষ: একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক যুদ্ধের ফলে বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ ধূলিকণা ও ছাই ছড়াবে, তা সূর্যের আলো আটকে দেবে। ফলে বিশ্বজুড়ে শস্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে দেখা দেবে ভয়াবহ ‘পারমাণবিক দুর্ভিক্ষ’।

স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ১৭টি বড় কারণ

গবেষকরা ১০০ কোটি বা তার বেশি সুস্থ জীবন নষ্ট করতে পারে—এমন সংকটগুলোকে ‘মেজর ক্যাটাস্ট্রফিক থ্রেট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হুমকি হলো:

  • জলবায়ু পরিবর্তন: বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের দিকে ধাবিত হলে তা স্বাস্থ্যের ওপর অভূতপূর্ব বিপর্যয় ডেকে আনবে। তবে বিশ্ব উষ্ণায়ন ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে প্রায় ১৮৯ কোটি সুস্থ জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
  • আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহায়তায় কাটছাঁট: স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমলে ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ১৫০ কোটি সুস্থ জীবন নষ্ট হতে পারে, যার ৭০ শতাংশ ক্ষতিই হবে সাব-সাহারান আফ্রিকায়।
  • অন্যান্য হুমকি: বায়ুদূষণ, শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও স্থূলতা।

উন্নত ও নিম্ন আয়ের দেশের ভিন্ন চিত্র

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্যের প্রধান হুমকিগুলো ভিন্ন হয়:

  • উচ্চ আয়ের দেশ: স্থূলতা ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা প্রধান সংকট।
  • নিম্ন আয়ের দেশ: শিক্ষার নিম্নহার এবং শিশুদের পুষ্টিহীনতা স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বনেতাদের প্রতি সতর্কবার্তা

কমিশনের সহ-সভাপতি ও ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের পরিচালক অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারে বলেন, “আজকের নেতাদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে পরবর্তী প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ। তিন বছর আগে ভাবা হয়েছিল কেবল যুদ্ধ, জলবায়ু ও মহামারীই প্রধান হুমকি; কিন্তু বাস্তবে হুমকির তালিকা আরও অনেক বড়। বিশ্ব সরকারের উচিত এই ঝুঁকিগুলো আগাম অনুধাবন করে তা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করা।”

ল্যানসেট কমিশন জানিয়েছে, বৈশ্বিক এই ঝুঁকিগুলো পর্যালোচনা করতে প্রতি বছর তারা নতুন তথ্য হালনাগাদ প্রকাশ করবে।

সর্বশেষ