১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়ার জীবনাবসান

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

গ্রেপ্তার হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন; কিন্তু দেশ ছেড়ে যাননি—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন দৃঢ় অবস্থানের কারণেই তিনি পরিচিত ছিলেন ‘আপসহীন নেত্রী’ নামে। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর নেই। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।

মঙ্গলবার ভোর ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন।

শেষ সময়ের মুহূর্ত

মৃত্যুকালে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। হাসপাতালে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও।

মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ও সারাদেশে শোকের আবহ নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শোকবার্তায় ভরে ওঠে।

দীর্ঘ অসুস্থতা

লিভার ও কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিসসহ নানা দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। গত ২৩ নভেম্বর থেকে তিনি বসুন্ধরায় এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দোয়া চাওয়া হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।

রাজনীতিতে ‘আপসহীন’ অবস্থান

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন অবস্থানের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করলেও তিনি কখনো দেশত্যাগ করেননি। সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে কখনো পরাজিত হননি।

১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়ার শৈশব কেটেছে দিনাজপুরে। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান-এর সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর একজন গৃহবধূ থেকে বিএনপির নেতৃত্বে উঠে আসেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে কোনো আপস না করে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।

রাষ্ট্রক্ষমতা ও পতনের অধ্যায়

১৯৯১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি আসনে জয়ী হয়ে তিনি হন বাংলাদেশের প্রথম নারী ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও তিনি সরকারপ্রধান হন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে বিএনপি।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থায় গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যান। ২০২০ সালে নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেলেও কঠোর শর্তে তাকে গৃহবন্দি জীবন কাটাতে হয়।

শেষ অধ্যায়

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া এবং উচ্চ আদালতে মামলাগুলো থেকে খালাস পান। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে লন্ডনে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন তিনি। সবশেষ গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়। এর মাত্র ৪০ দিনের মাথায় নিভে গেল ‘আপসহীন নেত্রী’র জীবনপ্রদীপ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া রয়ে যাবেন দৃঢ়তা, সংগ্রাম ও আপসহীনতার প্রতীক হয়ে।

সর্বশেষ